
১৬ জুলাই ১৯৭১ এই দিনে
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৬ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক সমাবেশে বক্তৃতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা মনে রাখবেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হবার জন্য রণক্ষেত্রে অস্ত্রধারণ করেনি। আমাদের বীর সন্তানেরা জয়লাভ করার জন্যই অস্ত্রধারণ করেছে। জয় আমাদের হবেই আপনারা জেনে রাখুন, যেখানে বিশ্বের জনমত আপনাদের পক্ষে সেখানে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবেই। আমাদের মহান বন্ধু প্রতিবেশী ভারতবর্ষ আমাদের ৬০/৭০ লাখ শরণার্থীকে কেবল আশ্রয়ই দেয়নি, আমাদের দাবির ন্যায্যতাকে স্বীকার করে নিয়ে আমাদের সাহায্য করার জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছে। সে জন্য ভারত সরকারের কাছে আমি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
ঢাকায় এদিনঃ
১৬ জুলাই রাত ৯টার দিকে ক্র্যাকপ্লাটুনের ছয় জন গেরিলা ঢাকার রামপুরায় ঢাকার সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করে। সেসময় ক্র্যাকপ্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল ২০ পাউন্ড প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, ডেটোনেটর ও ফিউজ। পাওয়ার স্টেশনের গেটে পৌঁছে ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিলারা প্রথমেই পুলিশ ও গার্ডদের ফাঁকি দিয়ে টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর তারা গার্ডের কাছ থেকে চাবি ছিনিয়ে নিয়ে অস্ত্রের মুখে অন্য গার্ড ও পুলিশদের রুম দেখিয়ে দিতে বাধ্য করে। সেসময় ক্র্যাকপ্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধারা ১৭ জন পুলিশকে বন্দি করে, অপারেটরকে ট্রান্সফর্মার রুমে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। ট্রান্সফরমার রুমে গেরিলারা বিস্ফোরক বসিয়ে ট্রান্সফরমার উড়িয়ে দেয়।
১৬ জুলাই পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে বলে, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল বারী ও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. আমিরুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত করা হয়েছে।’
ভারতে এদিনঃ
১৬ জুলাই কলকাতা বিমানবন্দরে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং বলেন, ‘পূর্ব বাংলা থেকে আগত শরণার্থীদের সামনে এখন কেবলই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আমি আজ আসামে শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে ফিরছি। আগামীকাল আমি কলকাতায় থাকব এবং বেশ কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করব। তবে, এখন এই বিষয়ে আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। দিল্লিতে ফিরেই আমি যা বলার বিস্তারিত বলব।’
একই দিনে কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য বিভাগের প্রধান মতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত পাঁচ লাখ গাঁট কাঁচা পাট বিক্রির জন্যে ক্রেতার খুঁজছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ থেকে যেন কোনো পাট পাকিস্তানের সামরিক সরকার চুরি করতে না পারে, সে জন্যই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার।’
পাকিস্তানে এদিনঃ
১৬ জুলাই রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, ‘আমি খুব শিগগিরই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। আমাদের দেশ এখন গভীর সংকটে দিন পার করছে। এই অবস্থায় জরুরি বিষয়গুলো নিয়েই আমরা আলোচনা করব। এখন দলমত নির্বিশেষে সবারই এগিয়ে আসা উচিত। পূর্ব পাকিস্তানে যা হচ্ছে তা যথেষ্ট উদ্বেগের।’
আন্তর্জাতিক মহলে এদিনঃ
১৬ জুলাই লন্ডনে চীনের দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ব্রিটিশ বাংলাদেশ স্টিয়ারিং কমিটি। সেসময় তারা বিক্ষোভ শেষে চীন দূতাবাসের প্রধান তথ্য কর্মকর্তার কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়। স্মারকলিপি দেওয়া শেষে বাংলাদেশ স্টিয়ারিং কমিটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনে গিয়ে আরেকটি স্মারকলিপি দেয়।
একই দিনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পূর্ব বাংলা থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রচুর বিতর্ক হয়। এদিন জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খানের রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে পাকিস্তান সরকার সদা প্রস্তুত আছে’। অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিনিধি নটরাজন কৃষ্ণণ বলেন, ‘এই অসহনীয় অবস্থার জন্য একমাত্র দায়ী পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন। তারাই গণহত্যা চালিয়ে, জনপদের পর জনপদ পুড়িয়ে সাধারণ মানুষকে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। শরণার্থীরা প্রাণের ভয়েই ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। এই দায় পাকিস্তান কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। শরণার্থীরা ভারতে ফিরতে হলে সর্বপ্রথম নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু, পাকিস্তান সরকার তা করবে না।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদিনঃ
১৬ জুলাই সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘জা রুবেজম’ পত্রিকায় ‘ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিবেদক উল্লেখ করে বলেন, ‘পাকিস্তানে ঘটতে থাকা বিয়োগান্তক ঘটনার এখন প্রায় চার মাস হতে চলল। ঘরবাড়ি ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানের লাখো মানুষ প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও বিহারের রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। শরণার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সরকারি হিসাব মতে, মে মাসে ছিল সাড়ে তিন মিলিয়ন, যা এখন ছয় মিলিয়নের বেশি। বর্ডার পার হওয়ার পরে তারা খড়ের কুঁড়েঘর বা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। খুব সামান্য কিছু লোক ব্যারাক ও সরকারি ভবনগুলোতে আছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে অবস্থানের কারণে মহামারির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’
‘পশ্চিমবঙ্গে ইতোমধ্যে প্রবেশ করা পাঁচ মিলিয়ন শরণার্থীদের অনেকে কলেরায় ভুগছেন। তবে, আনন্দের বিষয় প্রথম মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। উদ্বাস্তুদের অন্তঃপ্রবাহ ভারতীয় অর্থনীতির জন্যে বিশাল বোঝা। ভারত সরকার মনে করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্যে আগামী ছয় মাসে তিন বিলিয়ন রুপি প্রয়োজন এবং তার জন্যে জাতীয় বাজেটে চাপ পড়বে। অনেকে উসকানি দিচ্ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে। যাতে করে শরণার্থীরা ফিরে যেতে পারে। ইন্দিরা গান্ধী উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের জন্যে সাহায্য চাইলেন। সোভিয়েত সরকার এই অনুরোধের প্রতি সাড়া দিল এবং ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্যে ভারত ৫০ হাজার টন চাল পেয়েছে। এখন দক্ষিণ এশিয়ার বিষয়ে অনেক দেশের উদ্বেগ ও সহানুভূতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং তারা আশা করছে খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, যাতে শরণার্থীদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়।’
১৬ জুলাই বিবিসি থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে আর কিছুদিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তবে, এ বিষয়ে আমরা পাকিস্তান সরকারের কাছে জবাব চেয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। কিন্তু, তারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।’
দেশব্যাপী বিবৃতিঃ
১৬ জুলাই রাজশাহীতে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আজম বলেন, ‘পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করার জন্যই কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দেশ থেকে রাষ্ট্রবিরোধীদের নির্মূল করার জন্য এখন দেশপ্রেমিক জনসাধারণকে একত্রিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিজেদের শক্তি নেই, তারা ভারতের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে স্বাধীন হতে চায়। ভারত এদেশ দখল করলে তাদের অধীনতা থেকে স্বাধীনতা লাভ করা কিভাবে সম্ভব?’
একই দিনে বরিশালে শান্তি কমিটির এক সভায় মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভারতের দালাল দেশদ্রোহী মুক্তিবাহিনীকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে এরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কখনোই তা হতে দেবে না।’
দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধঃ
১৬ জুলাই টাঙ্গাইলের কালিহাতীর বল্লায় রণাঙ্গনে আটকে পড়া সৈন্যদের উদ্ধারের জন্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পাঁচটি নৌকায় সৈন্য ও বিপুল অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই করে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা এ অতর্কিত হামলা চালায়। অতর্কিত হামলায় হানাদারেরা দিশেহারা হয়ে যায়। এতে বেশ কয়েকজন হানাদার সেনা নিহত হয়। সেসময় মুক্তিবাহিনীর গুলিতে পাকিস্তানি হানাদারদের তিনটি নৌকাসহ হানাদারেরা ডুবে যায়। অন্যদিকে পলায়নরত হানাদারদের মুক্তিযোদ্ধা মনে করে বল্লায় অবস্থানরত হানাদারেরা গুলিবর্ষণ ও মর্টার শেলিং করে। পাকিস্তানি হানাদারদের নিজেদের মধ্যে নিজেদের হামলায় বহু হানাদার সেনা নিহত হয়।
একই দিন সন্ধ্যা ৫টা ৪৫ মিনিটে হানাদার সেনাদের আরও একটি দল নৌকায় বল্লার দিকে এগোতে চেষ্টা করলে মুক্তিবাহিনী তাদের লক্ষ্য করে গুলি শুরু করে। সেসময় মুক্তিবাহিনীর একটি কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা হানাদারদের ওপর হামলা চালালে হানাদার বাহিনীর সব নৌকা ডুবে যায়। এদিন বহু হানাদার সৈন্য কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকীর নির্দেশে আটককৃত হানাদার সৈন্যদের মুক্ত করতে ঢাকা থেকে ৩১ বেলুচ সৈন্যকে এনে আর্টিলারি ফায়ার করে হানাদার বাহিনী। কিন্তু, শেষমেশ হানাদার সৈন্যদের মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
মুন্সিগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটির সদস্য খলিলুদ্দিন শিকদার মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা অভিযানে নিহত হন।
১৬ জুলাই নওগাঁর রাণীনগরের তিলাবুদু গ্রামে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ওহিদুর রহমান ও আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর দুটি দল পাকিস্তানি হানাদারদের আসার খবর পেয়ে হানাদারদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সেসময় হানাদার বাহিনীর দুটো নৌকা ডুবে চার হানাদার সৈন্য নিহত হয়।
একই দিনে রাজশাহীর গোগরা বিলে রাজাকারেরা মুক্তিবাহিনীর একটি দলের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। রাজাকারদের অমানুষিক নির্যাতনে সেসময় দুই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অন্যদিকে রাজাকারেরা অন্য আরেক মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হককে আটক করে হানাদারদের হাতে তুলে দেয়।
১৬ জুলাই নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে রাজাকার কমান্ডার আলমাস আলীর নেতৃত্বে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়।
‘বীর সন্তানেরা জয়লাভ করার জন্যই অস্ত্রধারণ করেছে’, সৈয়দ নজরুল ইসলাম

আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হবার জন্য রণক্ষেত্রে অস্ত্রধারণ করেনি। ফাইল ছবি
১৯৭১ সালের ১৬ জুলাই দিনটি ছিল শুক্রবার। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের এক সমাবেশে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, আপনারা মনে রাখবেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হবার জন্য রণক্ষেত্রে অস্ত্রধারণ করেনি। আমাদের বীর সন্তানেরা জয়লাভ করার জন্যই অস্ত্রধারণ করেছে।
জয় আমাদের হবেই আপনারা জেনে রাখুন, যেখানে বিশ্বের জনমত আপনাদের পক্ষে সেখানে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবেই। আমাদের মহান বন্ধু প্রতিবেশী ভারতবর্ষ আমাদের ৬০/৭০ লাখ শরণার্থীকে কেবল আশ্রয়ই দেয়নি, আমাদের দাবির নায্য তাকে স্বীকার করে নিয়ে আমাদের সাহায্য করার জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছে। সে জন্য ভারত সরকারের কাছে আমি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
পাকবাহিনী নদী পথে নওগাঁ জেলার রানীনগর থানার তিলাবুদু গ্রামে প্রবেশের সংবাদ পেয়ে ওহিদুর রহমান ও আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে মুক্তি বাহিনী হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। এতে পাকবাহিনীর ২টি নৌকা ডুবে যায় এবং ৪ জন পাক সৈনিকের মুত্যু হয়। বল্লার রণাঙ্গনে আটকে পড়া সৈন্যদের উদ্ধারের জন্য পাকবাহিনী ৫টি নৌকায় সৈন্য ও বিপুল অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই করে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা চারান নামক স্থানে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। আকস্মিক আক্রমণে পাকসেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে পাকবাহিনীর তিনটি নৌকা বিধ্বস্ত হয়ে নদীতে ডুবে যায়। ফলে নৌকা তিনটির সকল পাকসৈন্য নিহত হয়। অপরদিকে, নদীর তীরে হেঁটে আসা পাকসেনারা পালাতে শুরু করলে বল্লায় অবস্থানরত পাকবাহিনী তাদের মুক্তিযোদ্ধা মনে করে প্রচন্ড গুলিবর্ষণ ও মর্টারের শেলিং করে। এতে বহুসংখ্যক পাকসৈন্য নিহত হয়। সকাল ৭টা থেকে শুরু করে বেলা ১১টা পর্যন্ত এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়।
ওই দিনই সন্ধ্যা ৫টা ৪৫ মিনিট পাকসেনাদের আরও একটি দল নৌকায় বল্লার দিকে এগোতে চেষ্টা করে এবং বৃষ্টির মতো গুলি করতে থাকে। নৌকাগুলো যখন মাঝ নদীতে আসে মুক্তিবাহিনীর একটি শক্তিশালী স্কোয়াড সব কটি নৌকা পানিতে ডুবিয়ে দেয়। ওইদিনের যুদ্ধে ৫১ জন দুর্বৃত্ত সৈন্য নিহত ও বহুসংখ্যক আহত হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি এক ট্রাক লাশ সন্ধ্যা ৭টায় মধুপুরের দিকে নিয়ে যেতে দেখেছেন। ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকীর নির্দেশ অনুযায়ী ঢাকা থেকে ৩১ জন বেলুচ সৈন্য এনে আর্টিলারি ফায়ার করেও আটক সেনাদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি।
রাত ৯টার সময় ৬ জন গেরিলা রামপুরায় অবস্থিত শহরের সবচেয়ে বড় পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেয়ার কাজ শুরু করে। তারা সঙ্গে করে ২০ পাউন্ড প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, ডেটোনেটর এবং ফিউজ নিয়েছিল। পাওয়ার স্টেশনের গেটে পৌঁছে তারা বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পুলিশ এবং গার্ডদের রাইফেলকে ফাঁকি দেয়। একই সময় একজন কমান্ডো টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তারা গার্ডের কাছ থেকে চাবি ছিনিয়ে নেয় এবং অস্ত্রের মুখে অন্য গার্ড এবং পুলিশদের রুম দেখিয়ে দিতে বাধ্য করে। তারা ১৭ জন পুলিশকে বন্দী করে এবং অপারেটরকে বাধ্য করে তাদের ট্রান্সফর্মার রুমে নিয়ে যেতে। ট্রান্সফরমার রুমে গেরিলারা এক্সপ্লোসিভ বসিয়ে ট্রান্সফরমার উড়িয়ে দেয়। অল্প কয়েকজন গেরিলা সফলভাবে অপারেশনটি সম্পন্ন করে।
মুন্সিগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটির সদস্য খলিলুদ্দিন শিকদার মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা অভিযানে নিহত হয়। রাজশাহীর গোগরা বিলে রাজাকার ও সশস্ত্র দালালরা মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। ঘাতকদের অমানুষিক নির্যাতনে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হককে আটক করে হানাদারদের হাতে তুলে দেয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল বারী ও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. আমিরুল ইসলামকে যথাক্রমে ঢাকা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত করা হয়।
পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আজম রাজশাহীতে বলেন, পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করার জন্যই কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দেশ থেকে রাষ্ট্রবিরোধীদের নির্মূল করার জন্য এখন দেশপ্রেমিক জনসাধারণকে একত্রিত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) নিজেদের শক্তি নেই, তারা হিন্দুস্থানের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে স্বাধীন হতে চায়। হিন্দুস্তানী ফৌজ এদেশ দখল করলে তাদের অধীনতা থেকে স্বাধীনতা লাভ করা কীভাবে সম্ভব?
মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির কার্যনির্বাহক কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার আখতারউদ্দিন আহমদ বরিশালে স্বাধীনতা বিরোধীদের সভায় নির্দেশ দেন কঠোর হাতে দুস্কৃতকারী মুক্তিযোদ্ধাদের দমন করার। স্বাধীনতা বিরোধীরা দেওভোগে আলমাস আলীর নেতৃত্বে ‘রক্ষীবাহিনী’ নামে একটি ঘাতক বাহিনী গঠন করে।
সোভিয়েত সাপ্তাহিক ‘জা রুবেজম’ ‘ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, পাকিস্তানে ঘটতে থাকা বিয়োগান্তক ঘটনার এখন প্রায় চার মাস হতে চলল। ঘরবাড়ি ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও বিহারের রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। শরণার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারী হিসাব মতে মে মাসে ছিল সাড়ে তিন মিলিয়ন যা এখন ৬ মিলিয়নের বেশি। বর্ডার পার হওয়ার পরে এরা খড়ের কুঁড়েঘর বা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। খুব সামান্য কিছু লোক ব্যারাক ও সরকারী ভবনগুলোতে আছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে অবস্থানের কারণে মহামারির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ইতোমধ্যে প্রবেশ করা ৫ মিলিয়ন শরণার্থীদের অনেকে কলেরায় ভুগছেন। তবে আনন্দের বিষয় প্রথম মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। উদ্বাস্তুদের অন্তঃপ্রবাহ ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বিশাল বোঝা।
ভারত সরকার মনে করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য আগামী ছয় মাসে তিন বিলিয়ন রুপী প্রয়োজন এবং তার জন্য জাতীয় বাজেটে চাপ পড়বে। অনেকে উস্কানি দিচ্ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে যাতে করে শরণার্থীরা ফিরে যেতে পারে। ইন্দিরা গান্ধী উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের জন্য সাহায্য চাইলেন। সোভিয়েত সরকার এই অনুরোধের প্রতি সাড়া দিল এবং ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য ভারত ৫০ হাজার টন চাল পেয়েছে। এখন দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে অনেক দেশের উদ্বেগ ও সহানুভূতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং তারা আশা করছে খুব দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে যাতে শরণার্থীদের বাড়ি ফিরে যাবার পরিবেশ তৈরি হয়।