
১১ জুলাই ১৯৭১ এই দিনে
১৯৭১ সালের ১১ জুলাই কলকাতাস্থ ৮ নং থিয়েটার রোডের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তরে সেক্টর কমান্ডারদের ৭ দিন ব্যাপী সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। সম্মেলনের শুরুতে কয়েকজন সেক্টর কমান্ডার মুক্তিযুদ্ধে ওয়ার কমান্ড কাউন্সিল গঠনের দাবি জানান।
এইদিন প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী করার সুপারিশ করা হয়। অনেকে এই দাবির স্বপক্ষে থাকলেও মেজর খালেদ মোশাররফ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এই ওয়ার কাউন্সিল গঠনের নাম করে এখন কর্নেল ওসমানীকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে সি আর দত্ত এই প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে থাকবেন না বলে ঘোষণা দেন। অন্যদিকে এই প্রস্তাবে কর্নেল ওসমানী বিরোধিতা করেন এবং একপর্যায়ে পদত্যাগ করেন। তারপর সভা থেকে বেরিয়ে যান। যদিও তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি এদিন।
সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানী ছাড়াও মন্ত্রিসভার সব সদস্য, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ রব, গ্রুপ, ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার, মেজর কে এম শফিউল্লাহ, মেজর সিআর দত্ত, মেজর খালেদ মোশাররফ, উইং কমান্ডার এম কে বাসার, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর মীর শওকত আলী, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর এ আর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ও মেজর এম এ জলিলসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। প্রথমদিনের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।
ভারতে এদিন
১১ জুলাই কলকাতার রাজভবনে ভারতের ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী আর কে খাদিলকর সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, 'ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো পাকিস্তানকে বিন্দুমাত্র চটাতে চায় না। ভারত যদি এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তবে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই যুদ্ধে জড়াবে। তখন আমাদের ওপরেই আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি আমরা এখনো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। পাকিস্তানের ওপরে এখনো সেই অর্থে কোনো আন্তর্জাতিক চাপ নেই। হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া সব দেশই এখনও পাকিস্তানের পক্ষে। এই মুহূর্তে আমরা যদি জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করি তবে তা সাড়া ফেলবে না। তাই ভারত এখনই জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করতে চায় না। ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে না। তবে তা কিছুটা সময় সাপেক্ষ।'
১১ জুলাই রাজস্থানের উদয়পুরে ভারতে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত উজামা এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পূর্ব বাংলার বিষয়ে ভারত সরকারের উদারনীতি খুবই আশাব্যঞ্জক। জাপান আশা করে ভারতের এই উদারনীতি বলবৎ থাকবে।
পাকিস্তানে এদিন
১১ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফর শেষে পাকিস্তানে ফিরে আসেন। এদিন রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠক শেষে এদিন রাতে হেনরি কিসিঞ্জার তেহরানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান ছেড়ে যান।
১১ জুলাই পাকিস্তানের লাহোর থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে পিডিপি’র সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান বলেন, 'একটি ইরানি সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকারে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো যে মীমাংসার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য ফর্মুলা দিয়েছে তা কেবল লজ্জাজনকই নয় বরং বিপজ্জনকও বটে।
বে-আইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তান সরকারের কোনো প্রকার মীমাংসাভিত্তিক ফর্মুলার ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করা উচিত হবে না। আর অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ। যেই আওয়ামী লীগের সাথে পাকিস্তানের আলোচনা করতে যাবে তিনিই জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ করবেন।'
আন্তর্জাতিক মহলে এদিন
১১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জনপ্রিয় ব্যান্ড সঙ্গীত দল বিটলস এক বিজ্ঞপ্তিতে বলে, 'ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের সাহায্যার্থে আগামী পহেলা আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনসে একটি কনসার্ট করছি আমরা। পন্ডিত রবিশঙ্করই আমাদের অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা।' পন্ডিত রবিশঙ্কর বিটলসের সাবেক সদস্য জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থীদের বিষয়ে একটি দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজনের কথা বলেন। এসময় হ্যারিসন দুই বছর আগে ভেঙে যাওয়া বিটলসের সাবেক সদস্যদের এই দাতব্য অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার অনুরোধ করেন। জানা যায় বিটলসের সাবেক সদস্য পল ম্যাকার্টনি মূল দলের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক না থাকায় আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। পন্ডিত রবিশঙ্কর এক বিবৃতিতে এদিন বলেন, এই কনসার্ট থেকে আয় করা সমস্ত অর্থ ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের জন্য ইউনিসেফের তহবিলে দান করা হবে।
১১ জুলাই প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যমে সানডে টাইমস একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে সানডে টাইমসের সাংবাদিক মারে শেলি বলেন, 'পাকিস্তান দাবি করছে পূর্ববঙ্গ এখন সম্পূর্ণ স্থিতিশীল ও শান্ত। যা পুরোদস্তুর মিথ্যা। দলে দলে এখনো নিরীহ সাধারণ মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। আমি সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখেছি। যেখানে গ্রামবাসী তীব্র উৎকণ্ঠায় বসবাস করছে। পাকিস্তান সরকার নিরীহ মানুষকে পাখির মতো হত্যা করছে। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য এর পরেও ক্রমাগত পাকিস্তান সরকার মিথ্যাচার করেই যাচ্ছে। পূর্ববঙ্গে যা হচ্ছে তা কল্পনাতীত।'
দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ
১১ জুলাই কুমিল্লায় সকাল ৮টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কামান ও গোলা নিয়ে মুক্তিবাহিনীর শালদা নদী অবস্থানের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সারাদিন গুলাগুলি শেষে মুক্তিবাহিনীর বেশ ক্ষতিসাধন নয়। হানাদারদের গুলিতে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গলের হাবিলদার তাজুল মিয়া ও সিপাই আব্দুর রাজ্জাক মারাত্মকভাবে আহত হন। তাছাড়া দুই জন বেসামরিক লোক নিহত ও ৮ জন আহত হয়।
১১ জুলাই কুমিল্লায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজারের দিকে যাওয়ার সময় সকাল ১১ টার দিকে মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশের মুখে পড়ে। এই সময় দুই দলের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। মুক্তিবাহিনীর হামলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১৫ জন সৈন্য এসময় নিহত হয়। পাকিস্তানি হানাদারেরা চার ঘণ্টা যুদ্ধ শেষে পিছু হটে ফিরে যায়।
১১ জুলাই খুলনার পাইকগাছায় মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট শামসুল আরেফিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা কপিলমুনির রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণ করে। এসময় রাজাকার ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শেষে মুক্তিবাহিনী নিরাপদে ঘাঁটিতে প্রত্যাবর্তন করে।
১১ জুলাই চাঁদপুরে বিকেল সাড়ে ৬ টায় মুক্তিবাহিনীর ২ গেরিলা সদস্য চাঁদপুর পাওয়ার স্টেশনের সামনে পাহারারত ২ হানাদার সেনা ও ২ পুলিশের উপর গ্রেনেড হামলা চালায়। এসময় চার জনই নিহত হয়।
- মুজিবনগরে ১১ জুলাই পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিবাহিনীর সেক্টর অধিনায়কদের প্রথম সম্মেলন শুরু হয়। সাত দিনব্যাপী এ সম্মেলন চলে ১৭ জুলাই পর্যন্ত। সম্মেলন উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।
- সভার শুরুতে সেক্টর অধিনায়কদের মধ্যে কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধে নতুন নেতৃত্ব বা কমান্ড কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব রাখেন।
- মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ওয়ার কাউন্সিলে সাতজন সামরিক সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়। সেক্টর অধিনায়কদের কয়েকজন এ প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন, খালেদ মোশাররফ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং সি আর দত্ত নিরপেক্ষ থাকেন। ওয়ার কাউন্সিলের প্রস্তাবকে ওসমানী তাঁর নেতৃত্বের জন্য হুমকি মনে করে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সভা থেকে বেরিয়ে যান। এতে সম্মেলনে কার্যক্রম কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত থাকে।
- খালেদ মোশাররফ ওয়ার কাউন্সিল গঠনের বিরোধিতা করে বলেন, এই কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি থেকে অপসারণের যেকোনো প্রচেষ্টা তিনি সর্বতোভাবে প্রতিরোধ করবেন। প্রধানমন্ত্রী সভা থেকে বেরিয়ে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করানোর জন্য ওসমানীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ওয়ার কাউন্সিলের প্রস্তাবকেরা ওসমানীর পদত্যাগ, তাঁর প্রতি সরকার প্রধানের সমর্থন এবং সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভক্তি—এসব বিবেচনা করে তাঁদের অবস্থান থেকে পিছিয়ে যান।
- সম্মেলনের কার্যক্রম প্রথম দিন স্থগিত থাকে। পরে এ নিয়ে আর আলোচনা হয়নি। ওসমানীর পদত্যাগপত্রও প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেননি।
- সম্মেলনে সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এম এ জি ওসমানী, এ কে খন্দকার, এম এ রব, এম কে বাশার, কাজী নূরুজ্জামান, সি আর দত্ত, জিয়াউর রহমান, কে এম সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, মীর শওকত আলী, আবু ওসমান চৌধুরী, নাজমুল হক, এ আর আজম চৌধুরী, এম এ জলিল, রফিকুল ইসলাম ও নুরুল ইসলাম।
- ১১ জুলাই নিউইয়র্কে ঘোষণা করা হয়, বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনসে একটি কনসার্ট করতে রাজি হয়েছেন। বিটলসের জনপ্রিয় গায়ক জর্জ হ্যারিসন ভারতের প্রখ্যাত সেতারবাদক রবিশঙ্করের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে কনসার্টের আয়োজন করছেন। অনুষ্ঠান থেকে আয় করা অর্থ বাংলাদেশের শরণার্থী, বিশেষত শিশুদের জন্য জাতিসংঘের তহবিলে দেওয়া হবে। জর্জ হ্যারিসন আর রবিশঙ্কর ছাড়াও অনুষ্ঠানে আরও কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পী যোগ দেবেন।
- লন্ডনের সানডে টাইমস এই দিন বাংলাদেশ নিয়ে পুরো পাতার নিবন্ধ প্রকাশ করে। নিবন্ধে বলা হয়, ‘পূর্ববঙ্গ শান্ত’ পাকিস্তানের এই দাবি অসত্য। মারে শেলির লেখা সে রিপোর্টে বলা হয়, শরণার্থীদের ছেড়ে যাওয়া একটি এলাকায় তিনি ঘুরে দেখেছেন। সেখানে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলেছেন। সেনাবাহিনী হিন্দু ও মুসলমানদের নির্বিচার গুলি করে মেরেছে। তিনি পাকিস্তানি একটি শরণার্থী শিবিরেও গিয়েছিলেন। সেখানে কোনো লোক ছিল না।
- ভারতের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী আর কে খাদিলকর কলকাতায় রাজভবনে সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, পৃথিবীর সব বড় শক্তিই ভারত-পাকিস্তান শক্তিসাম্য রক্ষা করতে চায়। ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে পাকিস্তান হঠকারীর মতো ভারতকে আক্রমণ করে বসতে পারে। বিষয়টি ভারত সতর্কতার সঙ্গে বিচার–বিবেচনা করে দেখছে। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ এখনো যথেষ্ট নয়। সে কারণে ভারত এখনই প্রসঙ্গটি জাতিসংঘে নিয়ে যেতে চায় না।
- ভারতে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত উজামা জয়পুরে সাংবাদিকদের কাছে বলেন, বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত সরকার যে মনোভাব গ্রহণ করেছে, তা খুবই ঠিক। বহু মিত্রদেশ তা সমর্থন করে।
- উত্তরাঞ্চলের রাজশাহীতে মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল খুব সকালে নওহাটায় ছোট বিমান অবতরণ ক্ষেত্রে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। সেখানে দুটি পাকিস্তানি হেলিকপ্টার ছিল। গেরিলারা গ্রেনেড নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টার দুটির পাইলট ইঞ্জিন চালু করে বিমান অবতরণক্ষেত্র থেকে চলে যান। কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা গ্রেনেড বিস্ফোরণে আহত হয়।
- মুক্তিবাহিনীর আরেকটি গেরিলা দল কুমিল্লার মিয়াবাজার এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দলকে অ্যামবুশ করে। এরপর দুই পক্ষে চার ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধে পাকিস্তানিদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়।
- খুলনা জেলায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল শামসুল আরেফিনের নেতৃত্বে পাইকগাছা থানার কপিলমুনির রাজাকার ঘাঁটিতে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়।
- ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুক্তিবাহিনীর শালদা নদী অবস্থানের ওপর পাকিস্তানি বাহিনী ভারী কামান ও মর্টারের সাহায্যে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এতে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। দুজন মুক্তিযোদ্ধা তাজুল মিয়া ও আবদুর রাজ্জাক মারাত্মকভাবে আহত হন। এ ছাড়া দুজন বেসামরিক লোক নিহত ও আটজন বেসামরিক লোক আহত হন।
প্রধানমন্ত্রীর কলকাতার অফিসে সেক্টর কমান্ডারদের সম্মেলন

সারাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। ফাইল ছবি
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের অফিস ভবনে তার সভাপতিত্বে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন দলের কমান্ডারদের প্রথম সম্মেলন (১১-১৭ জুলাই) শুরু হয়। সুষ্ঠুভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে সারাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। অধিবেশনে মুক্তিযোদ্ধাদের নানা ধরনের সমস্যা ও সমন্বিত ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডাররা হলেন:
১ নং সেক্টর:
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা এবং নোয়াখালি জেলার মুহুরী নদীর পূর্বাংশের সমগ্র এলাকা নিয়ে গঠিত। এ সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল হরিনাতে। সেক্টর প্রধান ছিলেন প্রথমে মেজর জিয়াউর রহমান এবং পরে মেজর রফিকুল ইসলাম।
২ নং সেক্টর:
ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর এবং নোয়াখালি জেলার অংশ নিয়ে গঠিত। এ সেক্টরের বাহিনী গঠিত হয় ৪- ইস্টবেঙ্গল এবং কুমিল্লা ও নোয়াখালির ইপিআর বাহিনী নিয়ে। আগরতলার ২০ মাইল দক্ষিণে মেলাঘরে ছিল এ সেক্টরের সদরদপ্তর। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন প্রথমে মেজর খালেদ মোশাররফ এবং পরে মেজর এ টি এম হায়দার।
৩ নং সেক্টর:
উত্তরে চূড়ামনকাঠি (শ্রীমঙ্গলের কাছে) থেকে সিলেট এবং দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সিঙ্গারবিল পর্যন্ত এলাকা নিয়ে গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর কে.এম শফিউল্লাহ এবং পরে মেজর এ এন এম নূরুজ্জামান।
৪ নং সেক্টর:
উত্তরে সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমা থেকে দক্ষিণে কানাইঘাট থানা পর্যন্ত ১০০ মাইল বিস্তৃত সীমান্ত এলাকা নিয়ে গঠিত। সিলেটের ইপিআর বাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে এ সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত এবং পরে ক্যাপ্টেন এ রব। হেডকোয়ার্টার ছিল প্রথমে করিমগঞ্জ এবং পরে আসামের মাসিমপুরে।
৫ নং সেক্টর:
সিলেট জেলার দুর্গাপুর থেকে ডাউকি (তামাবিল) এবং জেলার পূর্বসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। হেড কোয়ার্টার ছিল বাঁশতলাতে।
৬ নং সেক্টর:
সমগ্র রংপুর জেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা নিয়ে গঠিত। প্রধানত রংপুর ও দিনাজপুরের ইপিআর বাহিনী নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার। সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল পাটগ্রামের নিকটবর্তী বুড়ীমারিতে। এটিই ছিল একমাত্র সেক্টর যার হেড কোয়ার্টার ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।
৭ নং সেক্টর:
রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাংশ নিয়ে গঠিত হয়। ইপিআর সৈন্যদের নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এই বাহিনী ক্যাপ্টেন গিয়াস ও ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বে রাজশাহীতে প্রাথমিক অভিযান পরিচালনা করে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হক এবং পরে সুবেদার মেজর এ রব ও মেজর কাজী নূরুজ্জামান। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল বালুরঘাটের নিকটবর্তী তরঙ্গপুরে।
৮ নং সেক্টর:
এপ্রিল মাসে এই সেক্টরের অপারেশনাল এলাকা ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলা। মে মাসের শেষে অপারেশন এলাকা সঙ্কুচিত করে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা জেলা, সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে এই সেক্টর পুনর্গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরে মেজর এম এ মঞ্জুর। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল কল্যানীতে।
৯ নং সেক্টর:
বরিশাল ও পটুয়াখালি জেলা এবং খুলনা ও ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। এই সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল বশিরহাটের নিকটবর্তী টাকিতে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল এবং পরে মেজর এম এ মঞ্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদীন।
১০ নং সেক্টর:
নৌ-কমান্ডো বাহিনী নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এই বাহিনী গঠনের উদ্যোক্তা ছিলেন ফ্রান্সে প্রশিক্ষণরত পাকিস্তান নৌবাহিনীর আট জন বাঙালি নৌ-কর্মকর্তা।
১১ নং সেক্টর:
টাঙ্গাইল জেলা এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমা ব্যতীত সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম আবু তাহের। মেজর তাহের যুদ্ধে গুরুতর আহত হলে স্কোয়াড্রন লীডার হামিদুল্লাহকে সেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। মহেন্দ্রগঞ্জ ছিল সেক্টরের হেডকোয়ার্টার।
সকাল ১১ টায় মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশ দল পাকবাহিনীর একটি কোম্পানীকে মিয়াবাজারের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় অ্যামবুশ করে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। ৪ ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধে পাকবাহিনীর ১০/১৫ জন হতাহত হয়। পরে পাক হানাদাররা যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে পিছু হটে।
লে. শামসুল আরেফিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাইকগাছা থানার কপিলমুনির রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণ করে। তুমুল এ যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধা দল নিরাপদে বড়দল ঘাঁটিতে ফিরে আসে। সকাল ৮ টায় পাকবাহিনী ভারী কামান ও মর্টারের সাহায্যে মুক্তিবাহিনীর শালদা নদী অবস্থানের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সমস্তদিন গোলাগুলির ফলে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। গোলাগুলিতে ৪র্থ বেঙ্গলের হাবিলদার তাজুল মিয়া ও সিপাই আব্দুর রাজ্জাক মারাত্মকভাবে আহত হন। এছাড়াও ২ জন বেসামরিক লোক নিহত ও ৮ জন বেসামরিক লোক আহত হয়।
বিকেল সাড়ে ৬ টায় মুক্তিবাহিনীর ২ জন গেরিলা চাঁদপুর পাওয়ার স্টেশনের সামনে পাহারারত ২ জন পাকসেনা ও ২ জন পাক পুলিশের ওপর গ্রেনেড ছোঁড়ে। এতে সবাই নিহত হয়। পূর্ব-পাকিস্তান রেডক্রসের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম নূরুল ইসলাম জেনেভা সফর শেষে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী ড. হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফর শেষে পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন করেন এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। পরে তিনি প্যারিসের পথে তেহরান রওনা হন।
পশ্চিম পাকিস্তান পিডিপি’র সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান লাহোরে এক বিবৃতিতে বলেন, একটি ইরানী দৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বে-আইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বর্তমান সরকারের একটি মীমাংসাভিত্তিক ফর্মুলার ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করা উচিত বলে যে পরামর্শ দিয়েছে তা দুঃখজনক। জনাব খান বলেন, বে-আইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাথে পাকিস্তানের যেই আলোচনা করতে যাবেন তিনিই জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কাজ করবেন।