
০৮ জুলাই ১৯৭১ এই দিনে
08.07.1971
ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার তিনটি থানা হানাদার মুক্ত

দেশের বেশিরভাগ জায়গায় মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফাইল ছবি
সিলেটে ডাউকি ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর জৈন্তাপুর অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। এই অতর্কিত আক্রমণে বহু পাকসেনা নিহত হয়। অপরদিকে, মুক্তিযোদ্ধা মেজর মুত্তালিব আহত হন। সিলেটের মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর শাহবাজপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘাঁটি আক্রমণ করে। এতে ৭ জন পাকসেনা হতাহত হয়।
সান্ধ্যভোজে ধানমন্ডির ‘সাংহাই’ চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আগত পাকিস্তানী অফিসারদের ওপর মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের ছোঁড়া গ্রেনেডে কয়েকজন পাকিস্তানী অফিসার নিহত হয়। মেজর গাফফার বেলুনিয়া থেকে ফিরে এসে কোনাবনে আবার তার বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপন করেন।
পাকবাহিনীর সঙ্গে দু‘দিনব্যাপী প্রচন্ড যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা শহর দখল করে। আকাশবাণীর খবরে বলা হয়, মুক্তিবাহিনী প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার তিনটি থানা হানাদার মুক্ত করেছে। সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ প্রভৃতি রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সকালে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর নবীনগর অবস্থানের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে ৭ জন পাকসেনা ও ৫ জন দালাল নিহত হয়। অপরদিকে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়।
যুগোস্লাভিয়ার ‘ভেসার্নজে নভস্তি’ পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়, প্রায় তিনমাস হলো স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের দমাতে মিলিটারি এ্যাটাক শুরু হয়েছে। এই প্রথম সেখানে বিনা পাহারায় একজন বিদেশী সাংবাদিককে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে। যদিও বেশিরভাগ চিহ্ন সরিয়ে ফেলা হয়েছে তবে তাদের নৃশংসতার কিছু প্রমাণ এখনও আছে। রাজধানী ঢাকা এখনও ভয়, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের শহর।
সরকার বলছে ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’ যদিও রাস্তায় মানুষজন প্রায় চুপিসারে চলছে আর গাড়ি তেমন দেখা যাচ্ছে না। ঢাকায় অনেক সৈন্য আছে তবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে স্পেশাল পুলিশ স্কোয়াড আনা হয়েছে। তারা যানবাহন ও মানুষকে চেক করছে এবং গ্রেফতারের হার প্রচুর। ‘স্বাভাবিক’ এর একটি নমুনা হচ্ছে যদি কেউ বাংলা রেডিও-স্টেশনের অনুষ্ঠান শোনে তাহলে তার শাস্তি ভয়াবহ। অসংখ্য দোকান এখনও বন্ধ। গাড়ির নম্বর-প্লেটের বাংলা পরিবর্তন করে ইংরেজীতে লেখা হয়েছে। রাস্তায় কানাঘুষা চলছে যে পাকসেনারা এখনও বাঙালিদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে- তাদের গ্রেফতার করছে এবং কখনও কখনও মেরে ফেলছে। যদিও ট্যাংক এবং রকেট-এর ট্রেস মুছে ফেলা হয়েছে তবুও ভয়ের ছায়া স্পষ্ট।
পুরনো ঢাকা সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা এবং এখানে আওয়ামী লীগের সমর্থকের সংখ্যা বেশি। মার্কেটের অবস্থা খুব করুণ। নোংরা সরু পথ দিয়ে যেতে যেতে দুই পাশের ধ্বংস করা দালান দেখা যাচ্ছে। এগুলোর বেশিরভাগের মালিকানা ছিল হিন্দুদের। তারা ঘর ছেড়ে যাবার আগ পর্যন্ত তাদের নির্মমভাবে অত্যাচার করা হয়। ভারতে চলে যাওয়া সাড়ে ৬ মিলিয়ন পাকিস্তানীর মধ্যে ৪ মিলিয়ন ছিল হিন্দু। এদের বন্দুকের মুখে যেতে হয়েছে। সরকার তাদের মন্দির জ্বালিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর তাদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়িগুলো ‘অনুগত’ নাগরিকদের দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ঘানা থেকে প্রকাশিত ‘পালাভার উইকলি’ রিপোর্ট করেছে, ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতের অন্ধকারে রচিত হয় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধের এক চিত্র। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের পঁচাত্তর মিলিয়ন জনগণের বিরুদ্ধে একটি রক্তপিপাসু সামরিক জান্তা ঝাঁপিয়ে পড়ে। বহু সংবাদপত্র ফটোগ্রাফ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা দিয়ে ইতিহাসের নির্মম গণহত্যার রিপোর্ট প্রামাণিক আকারে প্রকাশ করে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ এমপি রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য রাষ্ট্রযন্ত্রের লোক ও জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবসহ অনেকে সরাসরি এই অপরাধের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ করেন। সব প্রমাণ ও রিপোর্টে এটিকে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দ্বারা নির্মমভাবে সম্পাদিত ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পিত ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মানব ইতিহাসে এমন নৃশংসতার অন্য কোন নজির নেই। পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিক, ডাক্তার ও ছাত্রসহ সবাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হচ্ছে। এটা সবার জানা যে- এই মানুষগুলোর একমাত্র অপরাধ ২৩ বছরের ইতিহাসে দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। তারা প্রায় এক বাক্যে তাদের নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে রায় দেন। শেখ মুজিব ও তার দলের একমাত্র অপরাধ যে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ওপর নেমে আসা তৎকালীন ঔপনিবেশিক অবস্থা শেষ করতে চেয়েছিলেন। একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।
দ্য স্টেটসম্যান এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিশেষ দূত ও নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারকে ভারতীয় নেতারা জানান যে মার্কিন সরকারের পাকিস্তানে অস্ত্র ক্রমাগত সরবরাহে উপমহাদেশে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়েই জোরালোভাবে জানান যে- তারা এটা মেনে নেবেন না। আমেরিকা ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে তারা শুধু অপ্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং তা শুধু আমলাতান্ত্রিক বন্ধনের কারণে। তারা বলেন যে এই কথা সত্য নয়। কিসিঞ্জারকে সামরিক অর্থের বাইরে থেকেই এর প্রভাব সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়।
কিসিঞ্জার স্পষ্টত বলতে চেয়েছেন এটা শুধু প্রান্তিক-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু নয়। শরণ সিং পাকিস্তানে ‘অব্যাহত এবং ক্রমাগত’ অস্ত্র সাহায্যের প্রতিকূল প্রভাব সম্পর্কে ড. কিসিঞ্জারের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি বলে তথাকথিত অপ্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়েও চরম মারাত্মক অস্ত্রের ইঞ্জিন সক্রিয় করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, পাকিস্তানে অস্ত্র সাহায্যের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন এবং উপমহাদেশের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারকে বলা হয় ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারটি দেখছে এটা কি আইনসিদ্ধ নয়? এর সঙ্গে সাড়ে সাত মিলিয়ন মানুষের মানবাধিকার জড়িত। সেটা বন্ধ করার জন্য পাকিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা দরকার।
আমেরিকান সাহায্যের কোন সুনির্দিষ্ট কারণ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী, পররষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কিসিঞ্জারকে আরও বলেন ২৯ জুন জেনারেল ইয়াহিয়ার ভাষণে যে রূপরেখা বলা হয় তা নেতিবাচক ছিল এবং তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পক্ষে বাস্তবসম্মত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, পূর্ববাংলার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নেতারা আমেরিকাসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে দাবি করেন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের যেন সব ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক সাহায্য বন্ধ করা হয়। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত যাতে এই ৭ মিলিয়ন উদ্বাস্তু নিরাপদ মনে করে ও সম্মানজনকভাবে ফিরে আসে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্সিয়াল এইডকে ভারত জানায় দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে ভারত টিকতে পারবে না এবং এই পরিস্থিতিতে ভারত অনির্দিষ্টকাল চুপ করেও বসে থাকবে না। এটা আন্তর্জাতিক মহলের দায়িত্ব যে তারা পাকিস্তানকে বাধ্য করবে একটি সঠিক রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহকারী ড. হেনরি কিসিঞ্জার সকালে নয়াদিল্লী থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে আসেন। সন্ধ্যায় তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন।
ব্রিটেনের লেবার পার্টির আন্তর্জাতিক কমিটির আজকের বৈঠকে পাকিস্তানের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং নিম্নলিখিত রেজুলেশন গৃহীত হয়। পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার মানুষদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এনইসি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং বিশ্বাস করে যে, পাকিস্তানের বর্তমান সংঘাত আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিল বিশ্বাস করে যে, এমন একটি অবস্থার অবতারণা হয়েছে যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ধ্বস নেমেছে, তাই উন্নয়নের জন্য সাহায্য অর্থপূর্ণ হতে পারে না। সুতরাং, কনসোর্টিয়ামের আসন্ন সভায় পূর্ব পাকিস্তানে যতদিন না পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি করা সম্ভবপর হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রতি সাহায্য ত্রাণ এবং প্রকৃত রোগ ও পীড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হয়, মনে রাখতে হবে যে, যেসব মানুষের সাহায্য অতি প্রয়োজনীয় তারা বর্তমানে পাকিস্তানে নেই।
কমিশন অবিলম্বে প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয়ে তাৎক্ষণিক ত্রাণ পৌঁছানো, জীবন বাঁচানোর জন্য স্থায়ী যন্ত্রপাতি স্থাপন করবে, অপরিহার্য চিকিৎসা সরঞ্জামে সজ্জিত করবে এবং যতদিন না পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব নয় ততদিন প্রয়োজন মোতাবেক পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেয়া।’ ভারত সরকার এই বোঝা অনুপাতহীনভাবে বহন করছে এবং সম্মেলন শরণার্থীদের সাহায্যে পূর্ণ দায়িত্ব নেয়ার জন্য জাতিসংঘের দুর্যোগ ত্রাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানায়। সন্তোষজনক রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া পাকিস্তানে দীর্ঘমেয়াদী সাহায্য একটি নিন্দিত সামরিক শাসনের প্রতি ভর্তুকি মনে হবে। সেই জন্য সম্মেলন সকল দেশ এবং বিশেষ করে পাকিস্তান এইড কনসোর্টিয়ামের সদস্যদের জরুরী মানবিক সাহায্য ব্যতীত সকল সাহায্য থামিয়ে রাখা উচিত যতদিন না পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মানূষ একটি সন্তোষজনক রাজনৈতিক সমাধানে সম্মত হচ্ছে।
পাকিস্তান শান্তি ও জনকল্যাণ কাউন্সিলের সভাপতি মৌলভী ফরিদ আহমদ পাকিস্তান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে মিসর ও সৌদী আরব সফর শেষে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি দেশের বর্তমান গুরুতর সঙ্কটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে ঘোষণা করা হয়, মার্কিন সরকারের বিধিনিষেধ আরোপ সত্ত্বেও এক থেকে দেড় কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন সামরিক সাজসরঞ্জাম পাকিস্তানে প্রেরিত হবে। সাবেক এমএনএ এবং পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলামের ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট আতাহার আলী জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করার জন্য আরো উদ্যমের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।