৭১ এর এই দিনে | mssangsad.com

৭১ এর এই দিনে

০৬ জুন ১৯৭১ এই দিনে

* মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ৬ জুন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া এক ভাষণে একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চারটি পূর্বশর্ত ঘোষণা করেন। শর্তগুলো হলো: ১. বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আটক সব গণপ্রতিনিধির অবিলম্বে মুক্তি; ২. বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপসারণ; ৩. স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বীকৃতি; এবং ৪. মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরোচিত আক্রমণে বাংলাদেশের অধিবাসীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ।


* সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, এসব দাবি পূরণ হলেই কেবল রাজনৈতিক সমাধান আসতে পারে, নইলে নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব বাঙালি একসঙ্গে লড়েছেন। বুকের রক্ত ঢেলে সবাই প্রমাণ করেছেন, তাঁরা অসাম্প্রদায়িক।


* মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের প্রশংসা করে সৈয়দ নজরুল বলেন, মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা যে মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন, জাতি তাতে গর্বিত। শহীদ ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের।


* বাংলাদেশের বিষয়ে বিশ্বনেতাদের জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং ছয়টি দেশ সফরের প্রথম পর্যায়ে ৬ জুন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমানে রাশিয়া) রাজধানী মস্কো পৌঁছান। ৭ জুন প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসিগিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করে তিনি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে যাবেন। সেখান থেকে লন্ডন হয়ে তাঁর ওয়াশিংটন যাওয়ার কথা।


* ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণও এই দিন লন্ডনে ব্রিটেনের রাজনীতিবিদ ও সরকারি প্রতিনিধিদের বলেন, বিশ্বসমাজ পূর্ব বাংলার পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তাড়াতাড়ি কোনো ব্যবস্থা না নিতে পারলে পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য ভারত চরম ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে পারে।


* হাঙ্গেরিতে রাজনীতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য একটি বেসরকারি তহবিল খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটির শ্রমিকেরা এই তহবিলে এক দিনের পারিশ্রমিক দেওয়ার ঘোষণা দেন।


* যুক্তরাজ্যের টাইমস পত্রিকা এই দিন সম্পাদকীয় নিবন্ধে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের যত দিন না সুবুদ্ধি হয়, তত দিন পর্যন্ত বৈদেশিক অর্থনৈতিক সাহায্য স্থগিত রাখার জন্য আবেদন জানায়। নিবন্ধে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে নিবৃত্ত রাখার জন্য এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।


* পাকিস্তানকে সামরিক ঋণ দিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যে অনুরোধ করেছেন, তা মঞ্জুর না করতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে গার্ডিয়ান পত্রিকা।


* ভারতের লক্ষ্ণৌয়ে সংখ্যালঘুদের জাতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ সংসদীয় প্রতিনিধিদলের নেতা ফণীভূষণ মজুমদার এবং সদস্য নূরজাহান মুরশিদ বক্তব্য দেন।


* নূরজাহান মুরশিদ অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখার প্রশ্ন আর উঠতে পারে না।


* সংখ্যালঘু সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে লোকসভার সহকারী নেতা জি জি সোহেল বলেন, বাংলাদেশের স্বীকৃতির প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, ঐক্য ও শান্তিশৃঙ্খলা যেন রক্ষা করা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে তাড়াহুড়া করে কেবল স্বীকৃতি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।


* পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় বলেন, কেন্দ্র বা সেনাবাহিনী শরণার্থীর ভার নিতে অনিচ্ছুক। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেক শ কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে শরণার্থীদের বিষয় নিয়ে আলোচনা করার পর অজয় মুখার্জি এ কথা বলেন।


* করাচির কূটনৈতিক মহল জানায়, ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ১০ জুন ওয়াশিংটনে চলে যাচ্ছেন। তিনি আর ফিরবেন না। যুক্তরাজ্যের ডেপুটি হাইকমিশনার ফ্রাঙ্ক সার্জেন্টও সপ্তাহখানেক পর লন্ডনে ফিরে যাবেন। দুজনের কার্যকালের মেয়াদ তখনো শেষ হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ রাত থেকে গণহত্যা শুরু করলে আর্চার ব্লাডের পাঠানো দাপ্তরিক চিঠি উদ্ধৃত করে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির সভাপতি উইলিয়াম ফুলব্রাইট বিবৃতি দিয়েছিলেন। আবার পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে টিক্কা খানের শপথ নেওয়ার সময় মিশনগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে ফ্রাঙ্ক সার্জেন্ট অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে এই দুজনকে নিয়ে পাকিস্তানে বিতর্ক শুরু হয়।


* জামায়াতে ইসলামীর প্রধান মাওলানা সৈয়দ আবুল আলা মওদুদি মুসলিম বিশ্বের নেতা এবং সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার কাছে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে বলেন, বাঙালি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা মুসলিম বিশ্বে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তকর তথ্য পরিবেশন করছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালি মুসলমানদের হত্যা করছে বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।


* চট্টগ্রাম রণাঙ্গনে চাঁদগাজীতে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ মোকাবিলা করেন। সেখানে যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ ক্ষতি হয়।


* মুক্তিযোদ্ধারা লাকসাম-নোয়াখালী সড়কে অ্যামবুশ করলে একটি পাকিস্তান সেনাদলের বেশ ক্ষতি হয়।