
২৩ মে ১৯৭১ এই দিনে
* ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ২৩ মে দিল্লিতে বলেন, পূর্ব বাংলা থেকে বিপুল সংখ্যায় শরণার্থী আসতে থাকায় ভারতকে এক গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শরণার্থীদের চাপ লাঘব করতে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো এগিয়ে না আসায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, শুধু দু-একটি দেশ যৎসামান্য সাহায্য করেছে, তা-ও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
* ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার চাকুলিয়া এবং চব্বিশ পরগনার পেট্রাপোল সীমান্তে শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করেন। এরপর সাংবাদিকদের বলেন, পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা পূর্ব বাংলার মানুষদের ওপর যে অত্যাচার করছে, তা কলঙ্কজনক। এ বর্বরতা বন্ধের জন্য বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কর্তব্য পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।এরপর তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আলোচনার পর সাংবাদিকদের আরও বলেন, পূর্ব বাংলা থেকে এখনো বহু শরণার্থী আসছে। মানবতার কারণে ভারতের পক্ষে তা রোধ করা সম্ভব নয়।
* ভারতের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী রঘুনাথ কেশব খাদিলকর এদিন কলকাতায় সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবের আবেদনের পর রাষ্ট্রগুলোর ঔদাসীন্যে ভারত হতাশ ও মর্মাহত।
* বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে দিল্লিতে সর্বভারতীয় কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়নের সমন্বয়ে ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কমিটি অব ইন্ডিয়া ফর সলিডারিটি উইথ বাংলাদেশ নামে একটি ট্রেড ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়। কমিটি গঠনের সভায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা যোগ দেন। ১৪ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির সভাপতি হন ড. মৈত্রেয়ী বসু। সর্বসম্মতভাবে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, ১২ জুন সারা ভারতে বাংলাদেশ দিবস পালন করা হবে।
* পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে। চলমান বিশৃঙ্খলার মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না।
* ইয়াহিয়া খান বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটেছে, তা রাজনৈতিক অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থান দেশের পূর্বাংশে অহেতুক দুর্দশা সৃষ্টি করেছে। সেখানে দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে।
* ইয়াহিয়া আরও বলেন, ৬ দফা পাকিস্তানের আদর্শের বিরোধী। পূর্ব পাকিস্তানের নাম বাংলাদেশ করা নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনা ছিল এই নয়া নামকরণের অন্তরালে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। তিনি ২৪টি দিন একটি পাল্টা সরকার পরিচালনা করেছেন।
* ইয়াহিয়া আরও বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুঃখিত হয়েছেন, তবে তিনি সাহায্যেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
* পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে এ দিন খবর বের হয়, মিয়া মমতাজ দৌলতানা, খান আবদুল কাইয়ুম খান এবং ফজলুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী তিন মুসলিম লীগের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা চলছে।
* ইপিআরের সমন্বয়ে গড়া মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল লাতুতে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় প্রাণভয়ে স্থানীয় মানুষ একটি মসজিদে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তানি সেনারা মসজিদে গিয়ে ১৭ জনকে টেনে বের করে এনে গুলি করে হত্যা করে। এদের মধ্যে দুজন ছাড়া বাকি সবাই শহীদ হন।
* পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ দিন রংপুর সেনানিবাসের পেছনে নিসবেতগঞ্জ হাটে প্রায় ৫০ জন এবং নড়াইলের লোহাগড়ার ইতনা গ্রামে প্রায় ৩৯ জনকে হত্যা করে। ইতনা গ্রামে তারা বাড়িঘরও পুড়িয়ে দেয়।

২৩ মে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ইতনা গ্রামে ৩৯ জন স্বাধীনতাকামী মানুষকে গুলি করে হত্যা করে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এ দিনটি মনে পড়লেই ইতনাসহ লোহাগড়ার মানুষের চোখে জল আসে।
গণহত্যার শিকার ফেলু শেখের স্বজনেরা জানান, ২৩ মে ভোরে ফেলুসহ ইতনার মুক্তিকামী ৩৯ জন নিরীহ মানুষকে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। আতিয়ার শেখের পরিবারের সদস্যরা জানান, এই দিনে সরকারি উদ্যোগে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় না। কবরগুলো চিহিৃতকরণসহ কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। তবে, ইতনা গণগ্রন্থাগারের পরিকল্পনায় এবং শেখ সিরাজ ইশতিয়াক আফছার উদ্দিন ট্রাস্টের সহযোগিতায় ১৯৯৪ সালের ২৩ মে ইতনা স্কুল ও কলেজের পাশে ৩৯ জনের 'নামফলক’ স্থাপিত হয়েছে।
ইতনার কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এস এম আলী আজগর রাজা জানান, ১৯৭১ সালের ২৩ মে হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন ইতনা গ্রামের সৈয়দ শওকত আলী, সৈয়দ কাওছার আলী, সৈয়দ এসমত আলী, শেখ হাফিজুল হক হিরু মিয়া, সৈয়দ মোশাররফ আলী, শেখ তবিবর রহমান তবি, সিকদার ওয়ালিয়ার রহমান, সিকদার হাবিবুর রহমান, মোল্যা মকলেসুর রহমান, রাশেদ গাজী, বাদল শেখ, বানছারাম মন্ডল, হারেজ ফরির, তরু মিনা, হেমায়েত হোসেন, রবি মোল্যা, আব্দুস সামাদ মোল্যা চুন্নু, পাচু মিয়া খদগির, মতলেব শেখ ওরফে কালমতে, নালু খাঁ, শেখ রফিউদ্দিন লেংটা, নুরুদ্দিন শেখ, কেয়ামদ্দিন ওরফে কিনু ফকির, মির্জা মোবারক হোসেন, নুরু মোল্যা, কুটি মিয়া মোল্যা, কানাই স্বর্ণকার, মোল্যা আব্দুর রাজ্জাক, মোল্যা সফিউদ্দিন আহমেদ, মোল্যা মানসুর আহম্মেদ, মালেক শেখ, শিকাদার হাদিয়ার রহমান, নবীর শেখ, ফেলু শেখ, মোহন কাজী ওরফে পাগলা কাজী, আতিয়ার শেখ, জহির শেখ, ছরোয়ার রহমান লেংটা ও বাকু শেখ।