
২৫ এপ্রিল ১৯৭১ এই দিনে
* যুক্তরাষ্ট্রের ১০ জন সিনেটর ২৫ এপ্রিল এক যুক্ত বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলার জন্য আপৎকালীন ত্রাণকাজের ব্যবস্থা করেনি। আন্তর্জাতিক রেডক্রসকেও সেখানে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে পাশ্চাত্য দেশগুলো ও জাতিসংঘের উচিত হবে পাকিস্তানে বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ওয়াল্টার মন্ডেল, এডওয়ার্ড মাস্কি, হিউবার্ট হামফ্রে, বার্চ বে, জর্জ ম্যাকগভার্ন, ফ্রেড হ্যারিস, হ্যারল্ড হিউস, উইলিয়াম পক্সমায়ার, টমাস এগ্রেটন ও ক্লিফোর্ড কেস।
* পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়া আরশাদ হোসেন এই দিন মস্কো যাত্রা করেন। তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বার্তা নিয়ে যান।
* অবরুদ্ধ বাংলাদেশে: পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ খ অঞ্চলকে (বাংলাদেশ) তিনটি সামরিক সেক্টর এবং ১০টি সাব-সেক্টরে ভাগ করে। সেক্টর তিনটি হচ্ছে ঢাকা, কুমিল্লা ও বগুড়া। কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি তাদের উদ্দেশ্য সফল করার জন্য জেলা ও মহকুমা সদরে শান্তি কমিটি গঠন করতে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধিদের পাঠানোর ঘোষণা দেয়। রাজশাহীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আফাজউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে জেলা শান্তি কমিটি গঠিত হয়।
* পাকিস্তানের জঙ্গি বিমান এই দিন বরিশালের ওপর অনবরত বোমাবর্ষণ করে। হেলিকপ্টারে করে সেখানে তারা ছত্রীসেনা নামায়। এ ছাড়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিনটি দল বরিশালের তিন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। একটি দল মুলাদীর দিক থেকে বরিশালের দিকে এগোয়। অন্য দুটি দল খুলনা ও ফরিদপুর থেকে অগ্রসর হয়। বরিশাল শহরের কয়েক মাইল উত্তরে জুনাহার নামে একটি জায়গায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় দুই পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রতিরোধ করতে সফল হননি। পাকিস্তানি সেনারা অবশেষে এই দিন বরিশাল শহর দখল করে।
* পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই দিন গোপালগঞ্জ শহরেও প্রবেশ করে। পাকিস্তানের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামান এবং তাঁর সহযোগীদের সহায়তায় তারা গোপালগঞ্জের খেলার মাঠ (বর্তমানে স্টেডিয়াম), ঈদগাহ মাঠ ও কলেজে শিবির স্থাপন করে।
* পাবনার কাশিনাথপুর ও উল্লাপাড়ার ঘাটনা সেতুতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা দুই স্থানেই পাকিস্তানিদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু চেষ্টা সফল হয়নি।
* পাকিস্তানি বাহিনী নওগাঁর তিলকপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গড়ের হাটে আক্রমণ করে এবং এখানে ১৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। তারা কুমরিয়া, জাফরাবাজ, লক্ষণপুর, মোহনপুর, হাপানিয়া, একডালা ও মাধাইমুরী গ্রামে আক্রমণ চালায়। কুমরিয়া, জাফরাবাজ ও মোহনপুরে ১১ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে তারা। এ ছাড়া কয়েকটি গ্রাম জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে দেয়।
* দিনাজপুর-রাধিকাপুর সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর একটি দলের যুদ্ধ হয়।
* চট্টগ্রামের করেরহাটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘর্ষ হয়। তুমুল যুদ্ধে করেরহাট প্রতিরক্ষাব্যূহের পতন হলে মুক্তিবাহিনী রামগড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়।
* সিলেটের গোলাপগঞ্জেও মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
যদিও তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে আকাশ পথ দিয়ে বর্তমান বরিশাল নগরীতে পাক বাহিনী ব্যাপক বোমা ও গুলিবর্ষণ করলেও তারা নগরীতে নামেনি। পাক বাহিনীর ধারণা ছিল, ব্যাপক সংখ্যাক বীর মুক্তিযোদ্ধা বরিশালে ঘাঁটি গেড়ে বসেছেন।
এ বিষয়ে তৎকালীন শহর ছাত্রলীগের সভাপতি বীর-মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত হোসেন চৌধুরী, বিভাগীয় সেক্টর কমান্ডার ফোরামের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রদীপ কুমার ঘোষ পুতুল ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরে আলম ফরিদ জানায়, ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল সড়ক পথে ফরিদপুর শহর পতনের পর পাক বাহিনীর বিশাল একটি ট্রুপ বরিশালের দিকে রওয়ানা দেয়। ভুরঘাটায় এ ট্রুপ ব্যাপক বাঁধার সম্মুখীন হয়। গৌরনদী উপজেলার কটকস্থলে মুক্তি বাহিনীর একাংশ বাধা দিলে এখানে ৫ মুক্তি বাহিনী সদস্য ও বেশকিছু পাক আর্মি হতাহত হয়।
এরপরেও পাক আর্মি সড়ক পথে বরিশালে পৌঁছায়। জলপথে পাক আর্মি গানবোট জুনাহারে নদীতে পৌঁছানোর পাশাপাশি দুটি হেলিকপ্টার থেকে পাক আর্মি প্যারাট্রুপার নামিয়ে দেয়। তালতলি ও জুনাহারে ব্যাপক সংখ্যক পাক আর্মি সশস্ত্র অবস্থায় কভারিং করে। অপরদিকে, পাক আর্মির গানবোট কীর্তনখোলা নদী তীরবর্তী স্থানে ফায়ার করতে থাকে। নদী পথে পাক আর্মি প্রতিহত করার জন্য চরবাড়িয়ায় মহাবাজ উচ্চ বিদ্যালয়ে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়।
ঝুনাহার নদীর সংযোগে ইরানী ও মাজভী নামে দুটি স্টিমার নোঙর করে বীর মুক্তিযোদ্ধারা আড়াল করে পজিশন সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। গান বোটগুলো যখন ঝুনাহার ও তালতলি অতিক্রম করেছিল তখন শায়েস্তাবাদ ও চরবাড়িয়া থেকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি ছুড়লে পাক গান বোট থেকে শেল বর্ষিত হতে থাকে। ‘ইরানী ও মাজভী’ এর ফলে ডুবে যায়। সেইদিন চরবাড়িয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান হারান তার স্বজন। পাকিস্তান আর্মিদের গুলিতে শহীদ হন আবদুল মান্নানের স্বজন আবদুর রহমান খান ও আলী আজিম খান।
বীর মুক্তিযোদ্ধারা আরো জানায়, এটি ছিল বরিশাল অঞ্চলে পাকিস্থানী বাহিনীর প্রথম গণহত্যা। এরপরে পাকিস্থান আর্মি বরিশাল শহরের ওয়াপদায় তাদের সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলে এবং বরিশাল জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে গণহত্যা চালিয়ে। ঔইদিন পাকিস্তান আর্মিদের গুলিতে শহীদ হন আমার পিতা আবদুর রহমান খান ও দাদা আলী আজিম খান।
এ প্রসঙ্গে আলাপকালে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ আবদুল মান্নান বলেন, ২৫ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে ১১টা হবে। সকাল থেকে দু’টি হেলিকপ্টার থেকে ছত্রী সেনা নামতে ছিল চরবাড়িয়াসহ বিভিন্নস্থানে, অন্যদিকে পাকিস্তানি গান বোটগুলোও বরিশালের দিকে আসতে ছিল। তবে জুনাহারে আসলে তারা বাঁধা পায়, কেননা অন্য দু’টি জাহাজ দিয়ে আড়াআড়ি বাঁধা দেয়া হচ্ছিল। এমন সময় আগে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ সেখানে অবস্থান করছিল।
মুক্তিযোদ্ধারা ফায়ার করলে গান বোট দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে পাকিস্তানি আর্মিরাও। এক পর্যায়ে তারা তালতলীতে নেমে ঘরে-ঘরে আগুন দিয়ে গুলি করতে থাকে। পরের দিন তারা চরমোনাই ইউনিয়নের কায়েকটি ঘরে আগুন দেয় ও গুলিবর্ষণ করে বরিশালের দিকে চলে যায়। বরিশাল ঘাটে পাক-বাহিনীর সদস্যদের বেশ কিছু স্বাধীনতা বিরোধী লোকজন স্বাগত জানায়। ২৫ এপ্রিল পুরো চরবাড়িয়া এলাকায় চলে পাক-বাহিনীর পৈশাচিক বর্বরতা। তারা যাত্রা পথে যাদের পেয়েছে তাদেরই হত্যা করেছে। মসজিদের ইমাম, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধা, মায়ের কোলের শিশুসহ বহু মানুষকে হত্যা করে তারা। এভাবে অনেককেই হত্যা করা হয় ওইদিন। আবার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নেয়ার খবর পেয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় সাপানিয়ায় প্রাচীর ঘেরা বাড়িটি।